সরকারি বা বিরোধী—উভয় দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই সাধারণত নিজেদের ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) হিসেবে দলের বিশ্বস্ত নেতাকর্মীদের মধ্য থেকেই কাউকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তবে চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদের পিএস নিয়োগকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিকখবর

দলীয় সূত্রের দাবি, তিনি পিএস হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা আসলাম হাবিবকে। এর আগে আসলাম হাবিব দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দুই সাবেক সংসদ সদস্যের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শুধু তাই নয়, ফ্যাসিবাদ সরকারের সময়কালে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা।

আওয়ামী লীগের পদধারী একজন নেতাকে বিএনপির সংসদ সদস্যের পিএস নিয়োগ দেওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের একজন নেতার সংসদ সদস্যের সঙ্গে নিয়মিত সংসদ ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠানে উপস্থিতি নিয়ে কেউ কেউ নিরাপত্তার প্রশ্নও তুলেছেন। আর বিএনপির এমপির পিএস হওয়ায় আসলামের ওপর ক্ষুব্ধ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরাও।

এছাড়া দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চন্দনাইশের সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য প্রয়াত নজরুল ইসলামের সাবেক পিএস সুব্রত বড়ুয়াও বর্তমানে জসিম উদ্দিন আহমেদের পিএস-২ (ঢাকাকেন্দ্রিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে আলোচনা রয়েছে।

জানা যায়, ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের সমর্থনে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জসিম উদ্দিন আহমেদ। দলের কোনো পদে না থাকলেও তাকে সমর্থন দিয়ে বিজয়ী করে আওয়ামী লীগের নেতারা। এছাড়া জসিম উদ্দিন আহমেদ পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ক্যাশিয়ার হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জসিম উদ্দিনের বর্তমান পিএস আসলাম হাবিব ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের আমৃত্যু সভাপতি আবুল কাশেম মাস্টারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২৪ সালের আমি-ডামি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সংসদ সদস্য এসএম আল মামুনের পিএস হন। এর আগে আল মামুন উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালেও তিনি তার পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়া সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আসলাম হাবিব। স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপজেলা কমিটিতেও তার পদ রয়েছে বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগের একজন পদধারী নেতা ও সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় এমপির পিএস কীভাবে বিএনপির এমপির পিএস হলেন তা নিয়ে এখন সর্বত্র আলোচনা চলছে।

দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশ্ন, বিএনপিতে কি একজনও বিশ্বস্ত নেতাকর্মী খুঁজে পাননি জসিম উদ্দিন। কেউ কেউ বলছেন, জসিম উদ্দিন নিজেও আওয়ামী লীগ করতেন। তাই তিনি বিএনপিতে লোক খুঁজে না পাওয়াই স্বাভাবিক।

দলীয় সূত্র জানায়, আসলাম হাবিবকে পিএস নিয়োগ করা হলেও তার নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়। চট্টগ্রামের ১৫টি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যদের পিএস কারা তা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার পেলেও বিষয়টি গোপন করেন জসিম উদ্দিন। তবে বিভিন্ন সভা, সেমিনার, সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাকে সংসদ সদস্যের সঙ্গে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিকখবর

সম্প্রতি ত্রাণ বিতরণের একটি অনুষ্ঠানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদ পকেট থেকে টাকার একটি বান্ডিল বের করে আসলাম হাবিবের হাতে দেন। তিনি টাকা গুনে কিছু অর্থ সংসদ সদস্যের হাতে ফেরত দেন এবং পরে সেই অর্থ অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য ও সমালোচনা শুরু হয়।

কে এই আসলাম হাবিব?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসলাম হাবিবের বাড়ি চন্দনাইশ উপজেলায় হলেও তিনি সীতাকুণ্ডে বেড়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাশেম মাস্টার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তার পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তার হয়ে সচিবালয়, মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে সবকিছু তদারকি করতেন তিনি। আসলাম হাবিব ওই সময়ের এমপির এতটাই বিশ্বস্ত ছিলেন যে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তাকেই এমপি হিসেবে ধরে নিতেন।

পরে আবুল কাশেম মাস্টারের ছেলে এসএম আল মামুন ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যান হন। সে সময় আসলাম হাবিবকেই বেছে নেয় আল মামুন। এমনকি সর্বশেষ আমি-ডামি নির্বাচনে কথিত এমপি হয়েও রাজনৈতিক পিএস হিসেবে আসলামকে নিয়োগ দেন মামুন। পরে তাকে উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকও করেন মামুন। এমপির ক্ষমতা ব্যবহার করে বহু বাড়ি-গাড়ি ও ব্যবসার মালিক বনে গেছেন আসলাম হাবিব—এমন গুঞ্জন রয়েছে এলাকাজুড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চন্দনাইশ ও সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতা জানান, কক্সবাজারে সাবেক এমপি আল মামুনের শতকোটি টাকার পাঁচতারকা হোটেল গ্রিন ন্যাচার রিসোর্ট অ্যান্ড সুইটস দেখভাল করেন জসিম উদ্দিন আহমেদ। মামুনের প্রতিনিধি হিসেবেই আসলাম হাবিবকে পিএস নিয়োগ দেন তিনি। তা ছাড়া কক্সবাজারে পাঁচতারকা রামাদা হোটেলের মালিকও এমপি জসিম উদ্দিন আহমেদ। যেখানে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদেরও শেয়ার রয়েছে। এগুলো ছাড়াও দেশে-বিদেশে বেশকিছু হোটেল রয়েছে জসিম উদ্দিন আহমেদ ও এসএম আল মামুনের।

সীতাকুণ্ডের বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর পিএস মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, জসিম উদ্দিন যেভাবে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে। একইভাবে আসলাম হাবিবও আওয়ামী লীগের এমপির পিএস থেকে বিএনপির এমপির পিএস বনে গেছেন। একসময়ে তার নির্যাতনে আমরা অতিষ্ঠ ছিলাম। বহু নেতাকর্মীকে আসলাম হাবিব জেলে দিয়েছেন, মামলা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার মামলাও রয়েছে। দক্ষিণ জেলার নেতাদের বিষয়টি জানিয়েছি তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ এখন নাকি তিনিই আমাদের দলের এমপির পিএস।

ভুয়া কল করে সমালোচনায় এমপি

সম্প্রতি সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদের একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। যেখানে দেখা যায়, তিনি মোবাইল কানে ধরে উপজেলার একজন কর্মকর্তাকে বলছেন, রাস্তা দ্রুত যেন মেরামত শুরু করে। তবে তার ফোনের স্ক্রিনে কোনো কল না থাকায় ভিডিওটি নিয়ে ব্যাপক ট্রল হয় সামাজিক মাধ্যমগুলোয়।

চন্দনাইশ বিএনপির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, যিনি ফোন না করেই জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেন, ইউনিয়ন পরিষদের ত্রাণ নিজের বলে চালিয়ে দেন তার পক্ষে সবই সম্ভব। তার কর্মকাণ্ডে আমরা সবাই বিরক্ত। দক্ষিণ জেলার আরেকজন সিনিয়র নেতা বলেন, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নজরুল ইসলামের পিএস সুব্রত বড়ুয়াও তার পিএস-২ হিসেবে কাজ করছেন। জসিম উদ্দিন নিজেও বলেন, তাকে নাকি বিএনপি ভোট দেয়নি। আওয়ামী লীগই তাকে এমপি বানিয়েছে।

সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদের কাছে এ বিষয়ে জানতে ফোন দেওয়া হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আমি বিদেশে চিকিৎসা করাতে এসেছি। পরে কথা বলব।

অন্যদিকে আসলাম হাবিব বলেন, আমি আওয়ামী লীগের দুই এমপির পিএস ছিলাম ঠিকই, কিন্তু এখন বিএনপির এমপির পিএস। আমি তাকে অফিসিয়াল কাজে সহযোগিতা করছি। আমি অতীতেও কোনো অবৈধ কাজে ছিলাম না, আশা করি ভবিষ্যতেও দেখবেন না।