রাজনৈতিক আন্দোলন মোকাবিলা করা আর মৃ*ত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে চলা সম্পূর্ণ এক নয় সাংঘর্ষিক। অতীতে নব্বইয়ের দশক / ২০০৭-০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনৈতিক মামলা, দুর্নীতির অভিযোগ বা নির্বাসনের যে প্রতিকূলতার মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছিল, সেখানে আপস, ক্ষমা কিংবা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে সমঝোতার সুযোগ ছিল।

বর্তমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ঘোষিত মৃ*ত্যুদণ্ডের রায়ে সেই অবকাশ নেই। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধে তার মৃ*ত্যুদণ্ড হওয়ার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৪৫৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। ফলে এটি আর কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় নেই, আদালতে প্রতিষ্ঠিত একটি বাস্তব চিত্র।
​২০২৪ সালের পলায়নের সাথে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে ফার্দাক স্পষ্ট হয়। এখানে জনরোষের তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ থেকে জীবন বাঁচিয়ে তিনি দেশত্যাগ করেছে— এটা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রায় ছিল না, ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল ও সংকটপূর্ণ। একদিকে আইনি প্রক্রিয়ায় মৃ*ত্যুদণ্ড চূড়ান্ত, অন্যদিকে দেড় বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের দাবি জনরোষকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশে ফিরলে তাকে একই সঙ্গে আইনি ফাঁ*সি এবং সম্ভাব্য গ*ণপিটুনির মতো দুটি প্রাণঘা*তী ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হবে।

​সরকার এবং জুলাই আন্দোলনের বৈধতার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানও এক ধরনের দ্বন্দ্বে আটকে আছে। প্রকাশ্যে ‘রায় কার্যকরে তাকে ফিরিয়ে আনার’ দাবি তোলা সহজ হলেও, তার কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিচারোত্তর শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত দুরূহ প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও দিল্লির তাকে হস্তান্তর না করার দ্বিধাই প্রমাণ করে যে মাঠের বাস্তবতা বক্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
​পুলিশ বাহিনীর মনোবল ও সাংগঠনিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার প্রত্যাবর্তনে বড় ধরনের সহিংসতা ঘটলে তা সামলানো পুলিশের পক্ষে কঠিন হবে। আবার ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক নজির ভেঙে—যেখানে সেনাবাহিনী জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিল—জনতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনী বা র‍্যাব নামানো কোনো সরকারের জন্যই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। এর সাথে ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি যোগ হলে আইনি ঝুঁকি আরও বাড়বে কমবে না। এটি এখনো শতভাগ প্রমাণিত না, মামলাটি পুনরায় চালু হলে তা অতিরিক্ত আইনি বোঝা তৈরি করবে।

​আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকেও তার উপস্থিতি সহায়ক নয়। ১৯৭৫ সালের জেল হ*ত্যাকাণ্ডের স্মৃতি মাথায় রেখে চরম উত্তেজনার মুহূর্তে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং তার অনুপস্থিতি দলটির অবশিষ্ট নেতৃত্বকে পুনর্গঠনের সুযোগ দিচ্ছে, যেখানে তার উপস্থিতি দলের জন্য আরও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

​ব্যক্তিগত ও আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুই দশকের ক্ষমতায় সঞ্চিত সম্পদ, পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ভারতের মতো দেশে দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়ের সুবাদে তার দেশে ফেরার আর্থিক বা ব্যক্তিগত কোনো তাগিদ নেই। ২০২৪ সালে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে তিনি আদর্শগত আত্মত্যাগের চেয়ে আত্মরক্ষাকেই সব সময় বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে।

​অনেকে বিপরীত যুক্তি দেখাতে পারে। সচেতন মহল মনে করেন ভারতের কৌশলগত হিসাবনিকাশ চিরকাল তাকে আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে নাও থাকতে পারে, কিংবা ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগপন্থী কোনো সরকার ক্ষমতায় আসলে ক্ষমার পথ খুলতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কোনো সর্বজনীন আইসিসি নয়, বরং এটি একটি দেশীয় বিশেষ আদালত হওয়ায় এর রায় কার্যকর সম্পূর্ণভাবে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি ও ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিস্তা পানিবণ্টন, সীমান্ত বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বহুমুখী স্বার্থের কারণে দিল্লি একক কোনো ব্যক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থান ঝুঁকিতে ঝুঁকিতে পড়তে চাইবে না। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভারত হাসিনাকে কেন্দ্র করে কৌশলগত চাল বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির খেলায় রয়েছে, যা মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের উচিত কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা। সার্বিক বিবেচনায়, তার নিকট ভবিষ্যতে দেশে ফেরার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

মুখে যতই বলুক দলবল নিয়ে ডিসেম্বরে দেশে আসব। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রচারণা। ভবিষ্যতের লক্ষ্যে দেশে থাকা নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে ফাঁকা বুলি। নেটিজেনদের ভাষায় জীবন্ত শেখের বেটি হাসিনা বাংলাদেশে আসবে না। মৃত্যুর পর মরাদেহ গোপালগঞ্জ পৌঁছাবে কি না রয়েছে সন্দেহ।