দেশ ও দলের বৃহত্তর স্বার্থে প্রায় নিশ্চিত বিজয়ের সম্ভাবনাময় একটি আসন সংগঠনের নির্দেশে ছেড়ে দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোঃ মোবারক হোসাইন যে উদারতা ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন—তা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিঃসন্দেহে বিরল। 

আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসন (মোহাম্মদপুর–আদাবর–শেরেবাংলা নগর ) এলাকায় মোবারক হোসাইনের সুপরিকল্পিত, ধারাবাহিক ও শ্রমনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আজ একটি শক্ত, সুসংগঠিত ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছে। এটি কোনো আকস্মিক সাফল্য নয়; এটি মাঠের রাজনীতি, গত ১৭ বছরের মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের নীরব ত্যাগের স্বাভাবিক ফল। শুধুমাত্র আদর্শ, শৃঙ্খলা ও জোটের সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিশ্চিত বিজয়কে ছেড়ে দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি উচ্চ মানদণ্ড স্থাপন ও সহানুভুতির উদাহরণ হয়ে থাকলো।

এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে—এই অর্জন, এই রাজনৈতিক আমানত কতটা দায়িত্বশীলভাবে রক্ষা করা হচ্ছে? জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা-১৩ আসনটি আল্লামা মামুনুল হক সাহেবকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তের নৈতিক দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক শালীনতার প্রতিফলন তাঁর আচরণে স্পষ্ট নয়। মনোনয়ন পাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ও জোট নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা, কোনো ধরনের সমন্বয় বা সহযোগিতার উদ্যোগ না নেওয়া—বরং আত্মকেন্দ্রিক ও অহংকারপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করা—রাজনৈতিক সৌজন্য ও দায়িত্ববোধ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জোটকে অবহিত না করেই জামায়াতের ঘাটি হিসেবে পরিচিত বাগেরহাট-১ আসনে মনোনয়ন জমা দেওয়া এবং সেখানে প্রচারণা শুরু করা। কখনো বাগেরহাটে নানা বাড়ি, কখনো লালবাগে জন্ম, কখনো মোহাম্মদপুরে বেড়ে ওঠা, আবার কখনো মুন্সিগঞ্জকে নিজ বাড়ি হিসেবে উপস্থাপন—এই বহুমুখী পরিচয়ের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। রাজনীতি কি তাহলে দায়িত্ব ও প্রতিনিধিত্বের জায়গা, নাকি একাধিক আসনে ভাগ্য পরীক্ষার মঞ্চ?

মাঠের রাজনীতি আবেগে নয়, সংখ্যায় কথা বলে। বাস্তব বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো আসনেই তাঁর নিজস্ব ভোটভিত্তি জামানত রক্ষার মতো সুদৃঢ় অবস্থানে রয়েছে—এমন প্রমাণ দৃশ্যমান নয়। অপরদিকে প্রায় উল্টো অবস্থানেই ছিলো জামায়াতের জনপ্রিয়তা।  তবুও বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নিজেকে অপরিহার্য ভাবার প্রবণতা দল, জোট এবং আদর্শিক রাজনীতির জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।

অনেকের মধ্যেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—ঢাকা-১৩–এ দৃঢ় লড়াই গড়ে তোলার পরিবর্তে কি নেপথ্যে  এমন কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা হচ্ছে, যার ফলাফল শেষ পর্যন্ত আসনটি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে? এই অবস্থার রাজনৈতিক দায় কার ?