বই মাথায়, বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে স্রোত পাড়ি”
সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে ২০২৬ সালেও স্কুলে যেতে নদী সাঁতরাতে হয় শিশুদের!
সামান্য বৃষ্টি হলেই পাহাড়ি ঢলে ফুলে ওঠে রূপেশরী নদী। তখন ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা বই-খাতা মাথার ওপরে তুলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁতরে যায় স্কুলে। কেউ স্রোতে ভেসে যায়, কেউ বন্ধুর হাত ধরে কোনোমতে পাড়ে ওঠে। এই দৃশ্য কোনো সিনেমার নয়, বাস্তব বাংলাদেশের।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর ও শ্রীপুর গ্রামের শতাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন এভাবেই ঘিলাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-এ যাতায়াত করছে। অথচ নদী পারাপারের জন্য নেই কোনো সেতু, নৌকা কিংবা বাঁশের সাঁকো।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নগ্নজিতা হাজং জানিয়েছেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের। সামান্য বৃষ্টিতেই নদীতে পাহাড়ি ঢল নামে, ফলে শিশুদের জন্য স্কুলে আসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষকদেরও একইভাবে নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়।
স্থানীয় অভিভাবকদের ভাষ্য আরও হৃদয়বিদারক। প্রতিদিন সন্তানদের নদীতে নামতে দেখে আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অসুস্থ রোগী নেওয়া কিংবা জরুরি প্রয়োজনে চলাচলেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এলাকাবাসীকে।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দীনি হাজংয়ের কথায় ফুটে উঠেছে বাস্তবতা:
“অনেক সময় জামা-কাপড়ের সঙ্গে বইও ভিজে যায়। তারপরও স্কুলে যাই, কারণ পড়াশোনা বন্ধ করলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এতদিনেও এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার দেলোয়ার হোসেন বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার আশ্বাস দিয়েছেন।
বাংলাদেশের অনেক এলাকায় এখনো শিক্ষা অর্জন মানে যুদ্ধ। কোথাও ভাঙা ভবন, কোথাও শিক্ষক সংকট, আবার কোথাও স্কুলে পৌঁছাতে নদীর স্রোতের সঙ্গে লড়াই। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা অবকাঠামোর দুর্বলতা নিয়ে আগেও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।
একটি সেতু শুধু নদীর দুই পাড়কে যুক্ত করবে না, এটি যুক্ত করবে শত শিশুর স্বপ্ন, নিরাপত্তা আর শিক্ষার অধিকারকে।
এই শিশুদের জন্য দ্রুত একটি নিরাপদ সেতু নির্মাণ হোক।
কারণ শিক্ষা পাওয়ার পথে কোনো শিশুর জীবন ঝুঁকিতে থাকতে পারে না।