চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ আ'লীগ নেতার প্রভাব। দিশেহারা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর কর্মকর্তা কর্মচারী
চট্টগ্রামে গত দেড় মাসে একের পর এক সরকারি দপ্তরে হামলা, কর্মকর্তাদের হুমকি, মব সৃষ্টি এবং টেন্ডার-সংক্রান্ত উত্তেজনার ঘটনায় চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে প্রশাসনে। একের পর এক ঘটে যাওয়া এসব বিশৃঙ্খল ঘটনার পেছনের কারণ অনুসন্ধানে নেমেছে সরকারের একাধিক তদন্ত সংস্থা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব ঘটনার নেপথ্যে মূল ইন্ধনদাতা হিসেবে উঠে এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সন্দ্বীপ পৌরসভার সাবেক সহ-সভাপতি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘লাকি এন্টারপ্রাইজ’ এর মালিক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ওরফে রয়েল নাসিরের নাম।
সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও চট্টগ্রামের সরকারি ঠিকাদারি খাতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। উল্টো বিগত সরকারের সময়ে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ঠিকাদারদের একটি অংশ এখনো আগের মতোই দাপট দেখিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যেই অন্যতম রয়েল নাসির, যিনি এখনো নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে সুকৌশলে প্রকাশ্য প্রভাব ধরে রেখেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২১ জুন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে অগ্রিম বিল পরিশোধের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে তা ঘিরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মসূচির সরাসরি নেতৃত্বে ছিলেন রয়েল নাসির। একদল লোক নিয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবরুদ্ধ করে চাপ সৃষ্টি করে। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতার কারণে টানা কয়েক দিন অফিসেই যেতে পারেননি ওই কর্মকর্তা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একপর্যায়ে তাকে বদলিও করা হয়।
এর কয়েক দিন আগে, গত ১৮ জুন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে অস্ত্রধারী একদল লোক প্রবেশ করে দুজন কর্মচারীকে মারধর করে এবং নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রাণনাশের ভয়ভীতি দেখায়। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার দাবি, ওই দপ্তরের কোটি কোটি টাকার টেন্ডার ও প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার গোষ্ঠী চাপ দিয়ে আসছিল, যার অন্যতম রূপকার রয়েল নাসির। শুধু এলজিইডি কিংবা শিক্ষা প্রকৌশলই নয়। অনুরূপ টেন্ডার কেন্দ্রিক উত্তেজনা ও কর্মকর্তাদের ওপর হুমকির ঘটনা ঘটেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিএডিসি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডেও (পিডিবি)।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বলছে, বিগত সরকারের আমলে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল, এলজিইডি ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নিজের বিশাল বলয় তৈরি করে রয়েল নাসির। সরকার পতনের পরও তাঁর সেই সিন্ডিকেট বা নেটওয়ার্ক অক্ষত রয়ে গেছে। অসাধু কিছু কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ঠিকাদার ও স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সহযোগিতায় তিনি এখনো বিভিন্ন সরকারি মেগা প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে।
বর্তমানে রয়েল নাসিরের প্রতিষ্ঠান ‘লাকি এন্টারপ্রাইজ’ এর অধীনে সন্দ্বীপ পৌরসভার রাস্তা ও ড্রেন উন্নয়নের প্রায় ৮ কোটি টাকার একটি শেষ পর্যায়ের প্রকল্প চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি আরও দুটি নতুন প্রকল্পের প্রায় ২২ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরের অধীনে মীরসরাইয়ের বাড়িয়াখালী মাওলানা লকিয়তুল্লা দাখিল মাদরাসা, ফটিকছড়ির দারুস সুন্নাহ কাদেরিয়া দাখিল মাদরাসা এবং বাকুলিয়া সরকারি কলেজ ভবন নির্মাণের কাজও করছে তাঁর প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া লাকি এন্টারপ্রাইজের নামে আরও তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) প্রক্রিয়াধীন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল রূপায়ণেও লাকি এন্টারপ্রাইজের একাধিক বড় কাজ চলমান আছে।
এদিকে, একটি সংস্থার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য, নগরের পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর এলাকায় রয়েল নাসিরের একটি ব্যক্তিগত কার্যালয় রয়েছে, যা মূলত নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গোপন আড্ডা ও বৈঠকের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ওই কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি গোপন বৈঠকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ছবি বিশ্লেষণ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, উক্ত বৈঠকে সন্দ্বীপ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জেবেননুর জেসীর স্বামী শামীম কায়সার, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রাজিবুল হাসান সুমন, সন্দ্বীপ থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার শামীম, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর এবং আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, তাঁদের মধ্যে শামীম কায়সার ও জেবেননুর জেসী সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজার দিন ঝটিকা মিছিল করার অপরাধে পরবর্তীতে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও তদন্তকারী সংস্থার সূত্রগুলো জানায়, সম্প্রতি নগরের কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর ও চট্টগ্রামের উত্তর জেলার বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ বের হওয়া ঝটিকা মিছিলগুলোতে ইন্ধন ও বিপুল অঙ্কের অর্থ জোগানের সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে এই রয়েল নাসিরের বিরুদ্ধে। পুরো বিষয়টি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারিতে রয়েছে।